বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম
জসিমেরও ইচ্ছে করে বাবার হাত ধরে শহীদ মিনারে আসতে (ভিডিও) হাকিমপুর নর্ব নিবাচিত মেয়রকে গণ সংর্বধনা পীরগঞ্জে মেয়র পদে আ’লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী অধ্যক্ষ খলিলের মতবিনিময় ডিমলায় শতভাগ খোলা জায়গায় পায়খানা মুক্ত এলাকা ঘোষনা লালমনিরহাটে বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন সাংবাদিক মুজাক্কির হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবিতে চিলমারীতে প্রতিবাদ সমাবেশ মুজিববর্ষ উপলক্ষে আটোয়ারীতে কন্যারত্মদের মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ ডোমারে মানবেতর জীবন যাপন বেদে পরিবারের ফুলবাড়ীতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আইসক্রীম তৈরী ফুলবাড়ীতে ৩৭৪ বোতল ফেন্সিডিল ও সাড়ে ১৫ কেজি গাঁজা উদ্ধার-আটক-১




তারাগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঘরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আশার আলো

তারাগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঘরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আশার আলো

এনামুল হক দুখু, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি :
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পাটনি সম্প্রদায়ের ২৫ টি পরিবার প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেয়ে জীবনযাপনে নতুন করে আশার আলো দেখছেন। এ উপজেলার ২নং কুর্শা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ঘনিরামপুর বড়গোলা নামক স্থানে যমুনেশ্বরী নদীর বেশ কাছাকাছি ৩৫ টি ঘরের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পাটনি সম্প্রদায়ের লোকের বসবাস। তাদের জীবনমান অত্যন্ত নি¤œমাণের। শুধুমাত্র বাঁশের গৃহস্থালীর কাজের জিনিষপত্র তৈরী করে যে টাকা আয় হয় তা নেহাতই অনেক কম।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে সমতলের ৬১ জেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের জন্য ঘর করে দেয়ার নির্দেশ দেন। এরই অংশ হিসেবে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ২৫টি পরিবার পাটনি সম্প্রদায়ের লোকেরা প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেয়েছেন। প্রতিটি ঘর সেমি পাকা। দো-চালা টিন যার মেঝে পুরোটাই পাকা করানো। এর প্রতিটি ঘরে ব্যয় হিসেবে ধরা হয়েছে এক লাখ করে টাকা।
নদীর খুব কাছাকাছি এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের বসবাস হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে নদীতে যখন পানি বেড়ে বন্যার সৃষ্টি হয় তখন তাদের ঘরের ভিতরে পানি ঢুকে যায়। এর ফলে বন্যার পানির কবল থেকে বাঁচতে গৃহের সবকিছু নিয়ে ঠাঁই নিতে হয় স্থানীয় ঘনিরামপুর বড়গোলা উচ্চ বিদ্যালয়ের বারান্দায়। তেমনি আবার ঠাÐা মৌসুমে নদী থেকে বয়ে আসা ঠাÐা বাতাসে গা শিউরে যায়। ঝুঁপড়ি ঘরের ভাঙ্গা বেড়া দিয়ে হিমেল বাতাস ভিতরে প্রবেশের ফলে ঘরে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে করে শীতজনিত নানান রোগে ভূগতে হয় তাদেরকে। চিকিৎসা করানোর তেমন কোন সামর্থ নেই এখানকার পাটনি সম্প্রদায়ের লোকদের। এর ফলে নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়েন অনেকে।
এই পাটনি সম্প্রদায়ের মানুষদের একমাত্র পেশা হলো বাঁশের কাজ। বর্তমানে আধুনিকতার যুগে আশঙ্কাজনকহারে কমে আসছে বাঁশের তৈরী জিনিষপত্রের। বাঁশের তৈরি জিনিষপত্রের মধ্যে টুকা,ঝুড়ি,খাঁচি বা শরপস,হাঁস-মুরগি রাখার জন্য এক ধরনের ঝুড়ি বা টাপা, চাটায়, আমের মৌসুমে আম পরিবহনের জন্য খাঁচা,বছরের দুইটি ধানের সময়ে ধান শুকানো ও সরবরাহের জন্য ডালি-কুলা ইত্যাদি। এসব তৈরি করে যে আয় হয় তাই দিয়েই চলে কোনরকম টানাটানি করে জীবন সংসার।
বর্তমান সময়ে প্লাষ্টিকের জিনিষপত্রের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে একমাত্র বাঁশের কাজ জানা এই সম্প্রদায়ের মানুষগুলো বেশ অর্থ কষ্টে ভুগছে। তাদের তৈরি জিনিষপত্রের স্থান বর্তমান সময়ে প্লাষ্টিক দখল করে নেওয়ায় বাজারে চাহিদা কমে গেছে। এতে করে যে পরিমাণ দ্রব্য সামগ্রী তারা তৈরি করছে সে পরিমাণ বিক্রি হচ্ছে না। তারাগঞ্জে সোম ও শুক্রবার দুই দিন হাটবার। এ এলাকাসহ এর আশপাশ এলাকা থেকে এ দুটি হাটের দিনে হাজারো মানুষ আসে তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় করার জন্য। হাটবারগুলোতে যে টাকা বিক্রি করে সে টাকা দিয়ে তারা জীবনধারনের জন্য খাদ্য সামগ্রী ক্রয় করে থাকে। আগে প্রতি হাটবারে বিক্রি হতো প্রতি পাটনি সম্প্রদায়ের লোকদের ৪হাজার থেকে ৫হাজার করে টাকা। এখন প্রতি হাটবারে বিক্রি হয় মাত্র ৫শ থেকে ১হাজার টাকা।
বাড়ির ছোট্ট বাচ্চা,মহিলা ও পুরুষেরা দিনরাত পরিশ্রম করে যে আয় হয় পরিশ্রমের তুলনায় তা নেহাতই কম। তারা সঠিকভাবে তাদের ন্যায্য মজুরি পান না।
পাটনি পাড়ার গোষ্ঠী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে বিনোদ বিহারী দাস। নিজেদের মধ্যে বিচার সালিশসহ শৃঙ্খলা ধরে রাখার জন্য নিজেদের তৈরি কিছু আইন কানুন বিধিনিষেধ আছে যা এখানে সবাই মেনে চলে। বিনোদ বিহারী দাস বলেন, আমরা গরীব মানুষ। দিনরাত পরিশ্রম করে যে টাকা আয় করি তা নেহাতই কম। মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে রয়েছে একটি ঝুঁপড়ি ঘর। ভাঙ্গা বেড়ার বাইরে থেকে চোখ দিয়ে তাকালে ঘরের ভিতরের সবকিছুই দেখা যায়। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কষ্ট করে জীবনযাপন করি কোনরকম। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আমাদের থাকার জন্য যে ঘর দিয়েছে তা নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। গরীব মানুষ হিসেবে কখনোই চিন্তা করতে পারিনি পাকা ঘরে থাকবো। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আমাদের পাকা ঘরে থাকার কপাল দান করেছে। আমরা চলমান শীতের দারুণ খারাপ প্রকোপ থেকে অনেকটাই রেহাই পেয়েছি। আগে ভাঙ্গা ঘরে যে ঠাÐা লাগতো এখন পাকা ঘরে রাতে ঘুমালে ঠাÐা টেরই পাই না।
বুধবার সকালে ঘনিরামপুর পাটনি পাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি ছেলে উপড়ে লালটিন নিচে টিনের বেড়া দেয়া ঘরের বারান্দায় বসে বাঁশের কাজ করছে। পরনে একটি প্যাণ্ট ও ছেঁড়া গেঞ্জি। তার নাম জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে সে বলে উঠলো আমার নাম অপূর্ব দাস। আমার বাবার নাম বাবলু দাস। আমি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। আমরা গরীব মানুষ। বাবা বছরের বেশিরভাগ সময়েই বাড়ির বাইরে থাকে। শুয়োর চড়ানোর জন্য বাইরে বাইরে থাকেন। আমাদের বাঁশের কাজ থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে আমাদের পেটে ভাত যাবে না। আমরা এক ভাই এক বোন। আমি বড়। আমার বোনটি আমার ছোট্ট। আমাদের সংসারে অভাব বেশি। থাকার ঘর ছিলো না । তাই মা আমার বোনকে আমার নানা বাড়ি পার্বতীপুরে রেখে এসেছে। বাবা প্রায় সময়েই কাজের জন্য বাড়ির বাইরে থাকেন। তাই মা আমাকে সাথে নিয়ে আমাদের ঝুঁপড়ি ঘরটিতে রাতের বেলায় ভয়ে ভয়ে রাত্রিযাপন করতো। আমি প্রায় লক্ষ করতাম মা কোন কোন রাত ঘুমাতো না। এতে আমার খুব কষ্ট্ লাগতো। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমাদের মত গরীব মানুষদেরকে থাকার জন্য ঘর করে দিয়েছে। এখন আমরা কোনরকম ভয় ছাড়াই রাত্রিযাপন করি। আমার মাও এখন শান্তিতে ঘুমায়। আমাকে খুব ভাল লাগে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের মায়ের দায়িত্ব পালন করেছে। আমি দোয়া করি আমাদের প্রধানমন্ত্রী হাজার বছর বেঁচে থাকুক।
বসতঘরের পাশাপাশি পাটনি সম্প্রদায়ের লোকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পাঁচটি পাকা শৌচাগারও দেওয়া হয়েছে এর আগে।
কুর্শা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি আফজালুল হক সরকার বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে অঙ্গীকার করেছেন এ দেশের কেউ গৃহহীন থাকবে না। তারই অংশ হিসেবে এ উপজেলার আমার এই কুর্শা ইউনিয়নের ২৫ টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবার তাদের স্বপ্নের আবাস পেয়েছেন। এটি সত্যিই আমার কাছে অনেক আনন্দের। ঝুঁপড়ি ঘরে থাকা গৃহহীন পরিবারেরা শীত ও বর্ষায় একটু শান্তিতে থাকবে এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দের।
৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা বলেন, আমার ওয়ার্ডের দরিদ্র লোকগুলো তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে। শীত ও বর্ষায় তাদের দুঃখ-কষ্ট দেখে নিজেকেই খুব খারাপ লাগে। ঘর পেয়ে অন্যরকম অনুভূতি বিরাজ করছে তাদের মধ্যে।
তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পাটনি সম্প্রদায়ের লোকদের হাতে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর সুবিধাভোগিদের হাতে তুলে দিয়েছি। তারা এ ঘর পেয়ে নতুন করে আশার আলোয় বুক বেঁধেছে। যথাসময়ে সুবিধাভোগিদের হাতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর দিতে পারায় সত্যিই আনন্দ লাগছে।

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © uttorersomoy.com
Design BY BinduIT.Com