বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:০১ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম
রহস্যময় ৮ মিনিটেই শেষ জীবন আত্মহত্যার আগে অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রী চিরকুটে লিখল ‘আমার পেটে জীবনের বাচ্চা’ কাউন্সিলর কাপ টাইগার বার ফুটবল টূর্নামেন্ট-২০২০ উপলক্ষে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ডিলারের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ৬ সুবিধাভোগীর মাঝে নতুন কার্ড প্রদান রংপুর মহানগরীর ১৮নং ওয়ার্ডে রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ কাজ শুরু ডোমারের চিলাহাটি হলদিবাড়ি রেলপথ পরিদর্শনে ভারতীয় হাই কমিশনার ইমরান তিস্তার চরাঞ্চলে সারা বাংলা ৮৮’র শীত সামগ্রী বিতরণ পীরগঞ্জে সাংবাদিকদের সাথে নবাগত ইউএনও’র মতবিনিময় দ্বিতীয় ধাপে করোনা মোকাবেলায় রংপুরে মাঠে নেমেছে ত্বোহা কনজুমার্সএন্ড ক্রেডিটস রংপুরে মাস্ক না পড়ায় ৬ হাজার টাকা জরিমানা




পাটের বাম্পার ফলন এবং ভালো দামে কৃষকরা খুশি

পাটের বাম্পার ফলন এবং ভালো দামে কৃষকরা খুশি

নিউজ ডেস্ক :
এবার দেশে বন্যায় কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উচ্চফলনশীল বীজ ও আবহাওয়া অনুকূল থাকায় পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ভাল উৎপাদন হওয়ায় এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় পাট চাষীরা খুব খুশি। যদিও মৌসুমের প্রথমদিকে খরার কারণে পাট শুকিয়ে যাচ্ছিল। পরে বৃষ্টি হওয়াতে পাট গাছে সতেজতা আসে। অন্যবারের তুলনায় এবার পাটপ্রধান প্রতিটি জেলায়ই পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে এবার পাটের ফলন ও মান বেশ ভাল। প্রতিবিঘায় প্রায় ১০ মণ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। আর প্রতিবিঘায় শুধু পাট বিক্রি করেই কৃষক লাভবান হচ্ছে ১৩ থেকে ১৭ হাজার টাকা। তার সঙ্গে পাটখড়ির দাম যুক্ত করলে প্রতিবিঘায় এবার কৃষকের লাভ হচ্ছে ১৮ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা। সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবার পাটের দাম নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন চাষী। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই ভাল দাম পাওয়ায় সব শঙ্কা উড়ে গেছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকলগুলো যথাযথ মূল্যে পাট কেনা শুরু করায় পাট চাষ করে কৃষক এবারও ভালই লাভের মুখ দেখছে। গত বছর দেশে ৬৮ লাখ বেল (এক বেলের ওজন ১৮২ কেজি) পাট উৎপন্ন হয়েছিল। চলতি মৌসুমে ৮২ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এবার মোট ৩ লাখ ১৬ হাজার ৪৯৪ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধেক পাট কাটা হয়েছে। যদিও এবার ২৬ হাজার ৯৬ হেক্টর জমির পাট বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। তারপরও গত বছরের চেয়ে এবার পাটের উৎপাদন বেশি হবে বলে কৃষি দফতর আশা করছে। পাট চাষী এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে পাট চাষ করে ৪০ লাখ চাষী। আর পাটকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪ কোটি মানুষের জীবিকা জড়িত। প্রতিবছর মৌসুমে কৃষকরা গড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা পায়। দেশের প্রায় সব জেলাতেই পাট উৎপন্ন হয়। তবে বেশি উৎপন্ন হয় ফরিদপুর, যশোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও জামালপুর জেলায়। ওসব জেলার পাটচাষী এবার পাটের ন্যায্য দাম পেয়ে খুশি। বাংলাদেশে বছরে উৎপাদিত পাট আঁশের শতকরা প্রায় ৫১ ভাগ পাট কলগুলোতে ব্যবহৃত হয়। আর প্রায় ৪৪ ভাগ কাঁচা পাট বিদেশে রফতানি হয় ও মাত্র ৫ ভাগ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে কাজে লাগে। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির শতকরা প্রায় ১২ ভাগ পাট চাষ এবং পাটশিল্প প্রক্রিয়াকরণ, আঁশ বাঁধাই, গুদামজাতকরণ, স্থানান্তর ও বিপণন কাজের সঙ্গে জড়িত। এবার ২ হাজার থেকে শুরু করে আড়াই হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ব বাজারে পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্যের রফতানিও বাড়ছে। বিশ্বের বহু দেশই এখন পলিথিন বর্জন করছে। ওই কারণেই এদেশের পাটপণ্যের রফতানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এ বছর পাটের দাম খুব একটা কমবে বলে মনে হয় না।
সূত্র জানায়, সরকারি জুট মিল বন্ধ হলেও বাজারে খুব একটা প্রভাব ফেলছে না। কারণ বিজেএমসি মৌসুমের শেষদিকে গিয়ে পাট ক্রয় করে। তবে বিজেএমসি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট ক্রয় করে না। তারা মূলত ফড়িয়ার কাছ থেকে পাট ক্রয় করে। আর অর্থ সঙ্কটে খুব স্বল্প পরিমাণে পাট ক্রয় করা হয়। যা বাজারে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে না। ফলে সরকারি মিল বন্ধের প্রভাব বাজারে পড়ার আশঙ্কা নেই। তাছাড়া সরকারি পাটকলগুলোর রফতানির পরিমাণও ছিল খুবই কম। সরকারি মিলগুলো মোট পাটপণ্য রফতানির মাত্র ৪ শতাংশ রফতানি করে। মূলত দেশের বেসরকারি খাতই সিংহভাগ পাটপণ্য রফতানি করে থাকে। সেজন্য বেসরকারি খাতের জুট মিলগুলো যাতে চালু থাকে এবং পাটপণ্য উৎপাদন করে রফাতিন করতে পারে সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন। তাহলেই কৃষ পাট আবাদ করে ভাল দাম পাবে। বিগত ৩/৪ বছর ধরেই কৃষক পাটের দাম ভাল পাচ্ছে। গত বছর মৌসুমের শুরুতে ১৫০০-১৬০০ টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হলেও পরে দুই হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে কৃষক পাট বিক্রি করে। পাটের বাজারের ওই উর্ধমুখী ধারাবাহিকতা এবারও বজায় রয়েছে। ফলে কৃষকরা মৌসুমের শুরু থেকেই পাটের দাম ভাল পাচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, প্রতি বিঘা জমি থেকে যে পরিমাণ পাটখড়ি পাওয়া যায় কৃষক তা ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারে। মৌসুমে প্রতিমণ পাটখড়ি ১৮০-২০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। যখন মৌসুম থাকে না তখন দাম পড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। দিন দিন দেশে পাটখড়ির চাহিদা বাড়ছে। পাটখড়ি পুড়িয়ে তার ছাই থেকে চারকোল তৈরি হয়। তারপর ওই চারকোল চীনে রফতানি হয়। চীনের পাশাপাশি বর্তমানে তাইওয়ান ও ব্রাজিলেও তা রফতানি হচ্ছে। বিদেশে পাটখড়ির ছাই থেকে মূল্যবান নানা পণ্য তৈরি হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। এ খাত থেকে বর্তমানে ১৫০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বাজার ধরতে পারলে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সহজেই আয় করা সম্ভব। মূলত বিগত ২০১২ সালে এদেশে চারকোল শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। তারপর থেকে বাণিজ্যিকভাবে পাটখড়ি থেকে কয়লা উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছোটবড় মিলিয়ে ৪০টির মতো চারকোল ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। একটি কারখানায় দৈনিক ৫০০ মণ পাটখড়ির চাহিদা রয়েছে। জুন-জুলাই দুই মাস ছাড়া সারাবছরই মিল চালু থাকে। একটি কারখানায় মাসে ১৫০-২০০ টন ছাই উৎপাদন হয়। আর প্রতিটন ছাই বাংলাদেশী মুদ্রায় ৫০ হাজার টাকা বিক্রি হয়। প্রতি হেক্টর জমিতে পাটখড়ি হয় প্রায় ২৫০ মণ। মৌসুমে ওই পাটখড়ি বিক্রি করেই ৫০ হাজার টাকা আয় করা যায়। আর মৌসুমের পর বিক্রি করতে পারলে আরো বেশি লাভ হয়। ফলে পাট এবং পাটখড়ি মিলিয়ে পাট এখন কৃষকের কাছে লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে।
এদিকে পাটপ্রধান জেলাগুলোতে কৃষক এখন পাট নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। কোথাও তারা পাট কাটছেন ও আবার অনেকস্থানে পাট জাগ দিচ্ছে। অনেকে আঁশ ছাড়িয়ে, পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে বিক্রির জন্য বাজারে নিচ্ছে। পাট চাষের প্রধান সমস্যা হলো আঁশ পচানোর পানি। অন্য বছর কৃষক পাট নিয়ে পানির পেছনে ছুটলেও এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়াতে তারা পাট ক্ষেতেই জাগ দেয়ার কাজ সারছে। পাট মূলত বৃষ্টিনির্ভর ফসল। এবারও মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি হয়নি। তখন পাটগাছের বৃদ্ধি কিছুটা কম হয়েছে। কিন্তু পাট কাটার সময় প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় পাট জাগ দিতে তেমন কোন সমস্যা হয়নি। তাতে পরিবহন ব্যয়ও সাশ্রয় হয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে এবার পাট চাষে খরচ অনেক কম হয়েছে। আর গতবারের তুলনায় এবার পাটের দাম ভাল হওয়ায় কৃষকরাও খুশি। তবে কিছুদিনের মধ্যে পাটের দাম আরো বাড়তে পারে। তাছাড়া পাটের পাশাপাশি এবার পাটকাঠিরও দাম ভালো।
অন্যদিকে ক্ষুদ্র পাইকার ব্যবসায়িরা এখন সাইকেল ও ভ্যানযোগে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পাট সংগ্রহ করছে। পাশাপাশি বেসরকারি পাটকলগুলোর জন্য দূরের পাট ব্যবসায়ীরাও হাটে এসে পাট কিনছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, কৃষকের পাটের প্রস্তুতি শেষ না হতেই পাইকাররা তাদের বাড়ি থেকে পাট সংগ্রহ করছে। কৃষকের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা মণ দরে ১ বেল পাট ১০ হাজার টাকায় ক্রয় করছে। বর্তমান বাজারে প্রতিমণ দেশী পাট ১ হাজার ৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকা এবং তোষা পাট ২ হাজার ২শ’ থেকে ২ হাজার ৪শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পাটের ফলনও ভাল। পাটের বর্তমান বাজারদর ও বিভিন্ন মিলে চাহিদা থাকায় চাষীর পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে। বাজারদর এভাবে থাকলে পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ আরো বাড়বে।

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © uttorersomoy.com
Design BY BinduIT.Com