শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:০৪ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম




রংপুরে শিশু পূর্ণিমার ধর্ষণ ও হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটন

রংপুরে শিশু পূর্ণিমার ধর্ষণ ও হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটন

সিটি রিপোর্টার :
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের হাজীরহাট থানাধীন অভিরাম মনোহর বাবুপাড়া গ্রামস্থ জনৈক শ্রী ফটিক চন্দ্র রায়(৩৯) এর মেয়ে পূর্ণিমা রানী রায়@সুন্দরী। বয়স আনুমানিক ১৪ বছর। সে মনোহর উচ্চ বিদ্যালয়ে ০৭ শ্রেণীতে পড়াশুনা করত। আর্থিক অনটনের কারনে পূর্ণিমা তার ঠাকুরমার বাড়ীতে থাকত। গত ২৫/০৭/২০২০খ্রিঃ তারিখ সকাল আনুমানিক ১১.৩০ ঘটিকার সময় হাজীরহাট থানা পুলিশকে জানানো হয় যে, ১৩ থেকে ১৪ বছরের পূর্ণিমা নামে একটি মেয়ে নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় জনগণের মাঝে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
উক্ত সংবাদ প্রাপ্তির পর পূর্ণিমার মৃত্যুর প্রকৃত কারন উদঘাটনের জন্যে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ, রংপুরের সম্মানিত পুলিশ কমিশনার জনাব মোহাঃ আব্দুল আলীম মাহমুদ বিপিএম মহোদয়ের নির্দেশে জনাব কাজী মুত্তাকী ইবনু মিনান, উপ-পুলিশ কমিশনার(অপরাধ) এর নেতৃত্বে জনাব মোঃ শহিদুল্লাহ কাওছার পিপিএম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার(অপরাধ), জনাব শেখ মোঃ জিন্নাহ আল মামুন, সহকারী পুলিশ কমিশনার (পরশুরাম জোন), জনাব মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান, অফিসার ইনচার্জ, হাজীরহাট থানা, জনাব মোঃ আবু মুসা সরকার, পুলিশ পরিদর্শক(তদন্ত) ও এসআই জনাব শাহ আলম‘সহ গঠিত তদন্ত টিম দ্রুত ক্রাইমসিন-এ উপস্থিত হয়ে এ বিষয়ে ব্যাপক তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেন। তারা পূর্ণিমার জ্যাঠা, জ্যাঠাতো বোন, ঠাকুরমা সহ ঘটনাস্থলের আশেপাশের লোকজনদের নিবিরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদে মৃতার আত্মীয়-স্বজন জানান যে, ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক ১০.০০ ঘটিকায় পূর্ণিমার ঠাকুরমা তামাকের কাজে এবং তার জ্যাঠা ও জ্যাঠিমা কৃষি কাজ করার জন্য বাড়ির বাইরে চলে যান এবং পূর্ণিমার জ্যাঠাতো বোন বিথী বাড়ির বাইরে চলে যায়। পূর্ণিমার জ্যাঠিমা ও জ্যাঠাতো বোন বিথী আনুমানিক সকাল ১১.৩০ ঘটিকার সময় বাড়িতে এসে পূর্ণিমাকে তার ঘরের মধ্যে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। প্রাথমিকভাবে তারা জানায় পূর্ণিমা নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তবে তদন্তটিম গোপন সূত্রের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, পূর্ণিমার মৃত্যুর পর একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি ঘটনাস্থলের আশে পাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন। সে ঘটনাস্থলের পাশে বিছানায় পড়ে থাকা ০১ টি মোবাইল ফোন সু-কৌশলে নিয়ে যায় এবং পুলিশ আসার আগেই সে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
পরবর্তীতে তদন্তটিম নারী পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় স্থানীয় মহিলাদের উপস্থিতিতে নিবিড়ভাবে মৃতা পূর্ণিমার সুরতহাল রির্পোট প্রস্তুতকালে মৃতার শরীরে ধর্ষন জনিত আলামত এবং গর্ভবতীর হওয়ার মতো শারীরিক গঠন দেখতে পেলে যথেষ্ঠ সন্দেহের সৃষ্টি হয়। সুরতহাল প্রস্তুত শেষে মৃত্যুর সঠিক কারন নির্ণয়ের লক্ষ্যে মৃতদেহ ময়না তদন্তের জন্য দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে প্রেরণ করেন। প্রাথমিকভাবে এ বিষয়ে কর্তব্যরত ডাক্তারের মতামত নেয়া হলে তিনি জানান যে, ভিকটিম পূর্ণিমা মারা যাওয়ার পূর্বে ধর্ষণ হয়েছিল এবং সে গর্ভবতী ছিল। কিন্তু ভিকটিম আত্মহত্যা করেছিল না তাকে পরিকল্পিভাবে হত্যা করা হয়েছিল সেই বিষয়ে চূড়ান্ত মতামতের জন্য ময়না তদন্ত পরীক্ষার পর জানা যাবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।
তদন্তটিম প্রাথমিক তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে ধর্ষনের সাথে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তি সুরজিত চন্দ্র রায়@ সুজিত’কে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। পলাতক আসামীর মোবাইল ফোনে ব্যবহৃত সীম কার্ডের সিডিআর পর্যালোচনা করে ধর্ষনের সাথে জড়িত আসামীর সাথে ভিকটিম এর মোবাইল ফোনে কথাপোকথন ও এসএমএস এ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেন। পূর্ণিমার মৃত্যুর সম্ভাব্য কারনসমূহ তার পরিবারের সদস্যদের জানানো হলে ভিকটিমের বাবা বাদী হয়ে সুরজিত চন্দ্র রায়@ সুজিত(১৯)কে আসামী করে হাজীরহাট থানায় সূত্রোক্ত মামলাটি দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার এসআই জনাব শাহ্ আলম এর উপর অর্পণ করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ এ মামলা তদন্তকালে ঘটনার পর থেকেই অপরাধের সাথে জড়িত আসামী পলাতক থাকে। তাকে গ্রেফতারের জন্য ব্যাপক পুলিশী অভিযান পরিচালনা করা হয়। ব্যাপক পুলিশী অভিযানের কারণে বাধ্য হয়ে পরবর্তীতে অপরাধের সাথে জড়িত আসামী সুরজিত চন্দ্র রায়@ সুজিত বিজ্ঞ আদালতে আতœসর্মপন করলে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের লক্ষ্যে সে দিনেই তদন্তকারী অফিসার বিজ্ঞ আদালতে পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করেন। বিজ্ঞ আদালত ০২ দিনের পুলিশ রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুর করেন। তদন্ত টিম অপরাধের সাথে জড়িত আসামী সুরজিত চন্দ্র রায়@সুজিত‘কে পুলিশ রিমান্ডে এনে নিবিড়ভারে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদে আসামী সুরজিত @ সুজিত ভিকটিম পূর্নিমাকে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার কথা স্বীকার করে। অপরাধের সাথে জড়িত আসামী সুরজিত চন্দ্র রায়@সুজিত‘কে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে তার দেয়া তথ্য মতে গুরুত্বপূর্ণ আলামত তথা মৃতার পাশে রেখে যাওয়া আসামীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও সীম কার্ড শ্যামলের নিকট থেকে উদ্ধারপূর্বক জব্দ করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ আলামত নিজ হেফাজতে রাখা এবং অপরাধের তথ্য গোপন করার কারণে তাকে গ্রেফতার করে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়। অপরাধের সাথে জড়িত আসামী সুরজিত চন্দ্র রায়@ সুজিত গত ০৮/০৮/২০২০ খ্রিঃ তারিখে বিজ্ঞ আদালতে ভিকটিম পূর্নিমাকে একাধিকবার ধর্ষণ, ধর্ষণ জনিত কারনে গর্ভবতী হওয়া এবং পরিকল্পিতভাবে হত্যার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অপরাধের সাথে জড়িত আসামী জানায় যে, পূর্ণিমার সাথে তার ০৭ মাস আগে পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং বিভিন্ন সময়ে সে পূর্ণিমাকে ধর্ষণ করে। একাধিকবার ধর্ষণ করার কারনে পূর্ণিমা গর্ভবতী হলে বিষয়টি জানতে পেয়ে আসামী সুরজিত @ সুজিত তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৫/০৭/২০২০ খ্রিঃ তারিখ সে সকাল ১০.০০ পরে ভিকটিমের শয়ন ঘরে প্রবেশ করে এবং তাকে প্রথমে ধর্ষন করে এবং ধর্ষণ শেষে সে পূর্ণিমাকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এ হত্যার ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে আসামী সুরজিত @ সুজিত মৃতা পূর্ণিমাকে ওড়না দিয়ে ঘরের তীরের সাথে ঝুলিয়ে রেখে পালিয়ে যায়।
সার্বিক তদন্ত ও পুলিশী তৎপরতার কারণে আসামী সুরজিত চন্দ্র রায় @ সুজিতকে আদালতে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। পরবর্তীতে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মৃতা পূর্ণিমা রানী রায় @ সুন্দরীকে ধর্ষণ, গর্ভবতী হওয়া ও ধর্ষণের পর পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়টি উদ্ঘাটন এবং মৃতার শয়ন ঘরে আসামী সুরজিত @ সুজিতের ফেলে যাওয়া মোবাইল ফোনটি উদ্ধারসহ মৃতার মৃত্যুকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা উদ্ঘাটনে সক্ষম হয়। এরফলে মৃতার পরিবার ও স্থানীয় লোকজন ধর্ষণ এবং হত্যার প্রকৃত কারণ জানার পর পুলিশের প্রতি সন্তোষ্টি প্রকাশ করেন।

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © uttorersomoy.com
Design BY NewsMoon.Com