মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন




কেন গেজেট করে আইনজীবী হিসেবে সনদ প্রদানের দাবি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী

কেন গেজেট করে আইনজীবী হিসেবে সনদ প্রদানের দাবি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী

পলাশ কান্তি নাগ
করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি ও বৈরী আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে টানা ৫ম দিনের মত বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট প্রাঙ্গণে আমরণ অনশন করছে সারাদেশের শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা। ইতিমধ্যে অনশনরত ২ জন শিক্ষানবীশ আইনজীবীকে গুরুত্বর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আরও অনেকে অসুস্থতা সত্বেও জীর্ণদেহ নিয়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের অনশনস্থলের মাটি আঁকড়ে পড়ে রয়েছে। আন্দোলন সম্পর্কে কতিপয় বিজ্ঞ আইনজীবীদের বিরুপ মন্তব্য,ঠাট্টা-বিদ্রুপ,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা প্রপাগান্ডাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে দাবি আদায়ে অনমনীয় মনোভাব নিয়ে তারা অনশন অব্যাহত রেখেছে। এমনকি অনশন পন্ড করতে হামলাও চালানো হয়েছিল।

অনশনকারীদের পেটে খাবার নেই,চোখে ঘুম নেই তবু যেন অসীম সাহস ও শৌর্যে লড়াই করছে। মৃত্যু না হয় আইনজীবী হিসেবে সনদ এই প্রত্যয় অনশনকারী সকলের চোখে মুখে দীপ্তিমান হয়ে উঠেছে। এই অনশনের পূর্বে জেলায় জেলায় ডিসি’র মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ,মানববন্ধন-সমাবেশ, বার কাউন্সিলের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত অঙ্গনে শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা করছে অথচ এখন পর্যন্ত কর্তাব্যক্তিরা কেউ এসে তাদের অভাব-অভিযোগের কথা শোনেনি। আজ যারা অনশন করছে তারা সকলেই তো বার কাউন্সিল এর সদস্য কিংবা সুপ্রীম কোর্টের বিজ্ঞ আইনজীবীদের সন্তান সমতূল্য। একবারও কি শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের কষ্ট-বেদনা তাদের হৃদয়ে রেখাপাত করে না। এ অবস্থায় শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের দাবি সম্পর্কে যে সকল বিজ্ঞ আইনজীবী নানা ধরণের নেতিবাচক মন্তব্য করছেন তাদের সকলেরই জানা শিক্ষানবীশ কাল কত কষ্টের।

কারণ তারা সকলেই আইনজীবী হওয়ার এই ধাপগুলো অতিক্রম করে আজকের এই পর্যায়ে এসেছেন। অনশনকারীদের দাবি সম্পর্কে ঢালাও ভাবে বিরোধিতা না করে তাদের বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই আমরা যৌক্তিকতা খুঁজে পাবো।

আজ কেন শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা তাদের পেশাগত জীবনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে মনে করছে? কেনই বা তারা বিপন্নবোধ করছেন তা গভীরে অনুসন্ধান করা প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। নিয়ম অনুযায়ী বছরে আইনজীবী তালিকাভুক্তির ২ টি পরীক্ষা সম্পন্ন করা বার কাউন্সিলের দায়িত্ব। ২০১২ সালের পূর্বে গড়ে ৮ মাসে একটি পরীক্ষা সম্পন্ন হতো। সেখানে বর্তমানে আড়াই তিন বছর পর পর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কোন কারণে একবার কেউ ফেল করলে তার ৫-৬ বছর সময় লেগে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রায় সকল পরীক্ষা অনুষ্ঠান ও ফলাফল প্রকাশ দ্রুততম সময়ের মধ্যেই হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম বার কাউন্সিলের আইনজীবী তালিকাভুক্তির পরীক্ষা। যে পরীক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা ও বিড়ম্বনার শেষ নেই। আজ যারা বৈশ্বিক এই মহামারীর কারণে রিটেন ও ভাইবা পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে আইনজীবী সনদের দাবিতে আন্দোলন করছে তারা নাকি করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে কিংবা পরীক্ষার টেবিলে বসতে ভয় পায় তাই রাস্তায় সনদ কুড়াতে এসেছে এমন মন্তব্য করছেন কেউ কেউ।

এইরুপ মন্তব্যকারীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই-আপনারা একটু পিছনে ফিরে তাকান। এই অনশনকারীরাই কিন্তু আবার দ্রুত পরীক্ষা অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলন করেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা এবং লিখিত পরীক্ষার খাতায় নাম ও রোল লিখার জন্য OMR সংযুক্তির দাবিতে চলতি বছরের ১৬ মে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে।

কবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। পরীক্ষা গ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ থাকলে নিশ্চয়ই এই দাবি উত্থাপিত হতো না। ২০১৭ ও ২০১৮ সালের এমসিকিউ উত্তীর্ণ ১২৮৭৮ জন শিক্ষানবীশ আইনজীবী করোনা মহামারীর কারণে রিটেন ও ভাইবা থেকে অব্যাহতি চেয়ে সনদ প্রার্থনা করেছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যদি রিটেন ও ভাইবা পরীক্ষা হতো তাহলে এরমধ্যে ২/৩ হাজার জন হয়তো সনদ পাবে না। এর বেশী তো নয়। নাকি কেউই সনদ প্রাপ্তির যোগ্যতা রাখে না।

বর্তমানে যারা শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের রিটেন ও ভাইবা পরীক্ষা ব্যতীত সনদ প্রদানের দাবিকে বিধি বহির্ভুত বলছেন, যদিও তা বিধি বহির্ভুত নয়। তারা কি কোনদিন এই যে বছরের পর বছর বার কাউন্সিল পরীক্ষা গ্রহণে কালক্ষেপন করছে তা নিয়ে কথা বলেছেন? বছরে ২ বার পরীক্ষা গ্রহণের নিয়ম থাকলেও যেখানে ৩/৪ বছরেও একটি পরীক্ষা সম্পন্ন হয় না তখন আপনারা কোথায় ছিলেন?

যখন পরীক্ষা অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ বলছে- The Bar Cauncil shall complete the enrollment process of the applicants to be enrollment as advocates in the distinct court each calendar year.
তখন বার কাউন্সিল এই আদেশ অমান্য করে কিভাবে? বার কাউন্সিল একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান জন্য কি জবাবদিহিতার উর্দ্ধে। শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের জীবনের মূল্যবান যে সময়ের অপচয় হচ্ছে তার দায় কে নেবে। আজ বৈশ্বিক মহামারীর কারণে গত ৩ মাস যাবত আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নিয়মিত আদালত চালুর জন্য বিজ্ঞ আইনজীবীরা আন্দোলন করছে,লেখালেখি করছে, সংবাদ সম্মেলন করছে। যেখানে বিজ্ঞ আইনজীবীরা ৩ মাস অপেক্ষা করতে পারছেন না সেখানে শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা কিভাবে ৩ বছর ক্ষেত্র বিশেষে ৫/৬ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করছে একবারও চিন্তা করেছেন। অন্যসব বিশেষায়িত পেশায় চিকিৎসক,প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, রসায়নবিদ প্রভৃতি ক্ষেত্রে এমন পরীক্ষা পদ্ধতি নেই।

পৃথিবীর অন্যকোন দেশে এমন পরীক্ষা পদ্ধতি আছে বলে আমার জানা নেই। ইংল্যান্ড,আমেরিকা,জার্মান, ফ্রান্স, ইতালি এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এলএলবি,এলএলএম পাশ করে বার কাউন্সিলে নির্ধারিত ফি দিয়ে আইনজীবী সনদ প্রাপ্ত হয়। আইনজীবী হিসেবে সনদ প্রদান করলেই কি সরকারের রাজস্ব থেকে বেতন-ভাতা দিতে হবে?জুডিসিয়ারি কিংবা বিএসসি পরীক্ষা তো প্রজাতন্ত্রের চাকুরীতে নিয়োগের জন্য। সেখানে ৩ ধাপে বাছাই করলেও করতে পারে। কিন্তু আইনজীবী হিসেবে পেশা পরিচালনার সনদ প্রদানের জন্য ৩ ধাপে পরীক্ষা গ্রহণের কোন যৌক্তিকতা আছে কি? ৩ ধাপে পরীক্ষা গ্রহণ যদি যোগ্যতা নির্ধারণের মাপকাঠি হয় তাহলে ২০১২ সালের পূর্বে যারা ৩ ধাপে পরীক্ষা দেয়নি কিংবা যারা শুধুমাত্র ভাইবা পরীক্ষা দিয়ে আইনজীবী হিসেবে সনদ প্রাপ্ত হয়েছেন, আমরা কি তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি? সেটা কি যৌক্তিক হয়? নিয়মিত আইন চর্চার মধ্য দিয়ে একজন আইনজীবীর দক্ষতা যোগ্যতা গড়ে ওঠে। আজকে যারা বিরোধীতা করছেন ৩ ধাপে পরীক্ষা পদ্ধতি থাকলে তাদের অনেকেই হয়তো এখনো শিক্ষানবীশ আইনজীবী থেকে যেতেন।

বৈশ্বিক এই মহামারীর কারণে ভারতে উচ্চ মাধ্যমিকের অবশিষ্ট পরীক্ষা থেকে শিক্ষার্থীদের অব্যাহতি দিয়ে ফলাফল ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে দেশের সরকার। বাংলাদেশে ৩৯ তম বিশেষ বিসিএস-এ শুধুমাত্র এমসিকিউ এবং ভাইবা নিয়ে চিকিৎসক নিয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ইতিহাসে দেখা গেছে-জাতির এক সংকট মূহুর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যাদের আইনে বিষয়ে কোন ডিগ্রী ছিল না, কিন্তু দীর্ঘকাল আইন পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকায় তাদের ডিগ্রী ছাড়াই অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় এনে আইনজীবী হিসেবে সনদ প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

যতদুর জানি যদি ভুল না হয়-বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার ১৯৭২ এর ৪০(১) এবং ৪০(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে ২০১৭ ও ২০২০ সালের এমসিকিউ উত্তীর্ণদের গেজেট প্রকাশ করে সনদ প্রদানে কোন বাঁধা নেই। অন্যদিকে বার কাউন্সিল ইচ্ছে করলে প্রস্তাবটি রেজুলেশন আকারে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে অনুমোদন নিয়ে আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করতে পারে। বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ যদি ৩ বার আইনজীবী তালিকাভুক্তির পরীক্ষায় ফেল করা বিচারপতির ছেলেকে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে উচ্চ আদালতে পেশা পরিচালনার সনদ দিতে পারেন তাহলে দেশের এই সংকটকালে এমসিকিউ উত্তীর্ণদের গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে আইনজীবী হিসেবে সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা কোথায়?

আজ ১২৮৭৮ জন এমসিকিউ উত্তীর্ণ শিক্ষানবীশ আইনজীবীর যেমন মরার উপর খরার ঘা অন্যদিকে আরো ৭০ হাজার শিক্ষানবীশ পরীক্ষার জন্য ব্যাকুল হয়ে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে। বাংলাদেশের আইনজীবীদের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল যদি বৈশ্বিক এই মহামারীরকালে বিশেষ বিধানের প্রয়োগ না করে তাহলে কবে করবে? আজ ৫ দিন যাবত শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা যে অনশন করছে তা দীর্ঘায়িত হতে দেওয়া মানে একটা অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া। যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের চলমান আন্দোলনের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। ফলে বৈশ্বিক এই মহামারীকালে মানবিক বিবেচনায় এমসিকিউ উত্তীর্ণদের রিটেন ও ভাইবা পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দিয়ে আইনজীবী হিসেবে সনদ প্রদান এবং আপীল বিভাগের আদেশ অনুযায়ী প্রতিবছর আইনজীবী তালিকাভুক্তির পরীক্ষা সম্পন্ন করার বিষয়ে বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নিবেন এই প্রত্যাশা সকলের।

লেখক- পলাশ কান্তি নাগ সাবেক ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক সংগঠক।

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © uttorersomoy.com
Design BY NewsMoon.Com