বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২০, ০১:০৩ অপরাহ্ন




করোনা ভাইরাসের কারনে পিছিয়ে গেল চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথ নির্মান কাজ

করোনা ভাইরাসের কারনে পিছিয়ে গেল চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথ নির্মান কাজ

এ.আই.পলাশ.চিলাহাটি.নীলফামারী প্রতিনিধি :
দীর্ঘদিন আন্দোলনের প্রায় ৫৬ বছর পরে বন্ধ হয়ে যাওয়া নীলফামারীর চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথে ভারতের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ পুনরায় স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশের চিলাহাটি থেকে ভারতের হলদিবাড়ি পর্যন্ত রেল যোগাযোগের লক্ষে রেললাইন বসানোর পূর্বেই সারাবিশ্ব সহ বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থাকায় রেললাইন বসানোর কাজ শুরু হওয়ার আগেই বন্ধ করে দেয় ম্যাক্স ইনফ্রাসট্রাকচার লিমিটেড। দীর্ঘ ২ মাস সব কাজ বন্ধ থাকার পর গত ৩০শে মে ২০২০ইং পুনরায় সেই কাজ চালু হলেও, এখনও কিছু জমি অধিগ্রহন না হওয়ায় থমকে আছে নতুন রেলপথ নির্মান (লুপলাইন)-২.৩৬ কি.মি-এর কাজ। চিলাহাটি রেলঘুন্টির পাশে ৪টি সংযোগ রেলের জন্য মাটি লেবেল করার কাজ শেষ হওয়ার পথে। ইতিমধ্যে পরিত্যাক্ত রেললাইনের উপর যেসব স্থাপনা ছিল তা সরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ অংশের সাড়ে সাত কিলোমিটার রেললাইন বসানোর পথটি সংস্কারের মাধ্যমে নতুন আঙ্গিকে কাজ করে এলাকাবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ম্যাক্স ইনফ্রাসট্রাকচার লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। রেলপথটি নির্মাণের কাজ এই বছরের জুন মাসের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও বেশকিছু নতুন অবকাঠামো ও রেললাইন সংযোগের কাজটি হয়ত ৫/৬ মাস পিছাতে পারে। ভারতের সঙ্গে রেলসংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে চিলাহাটি এবং চিলাহাটি বর্ডারের মধ্যে রেলপথ নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের ৮০ কোটি ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় ২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর একনেকের সভায়। তবে এই বরাদ্দকৃত অর্থে যে অবকাঠামো হওয়ার কথা ছিল, বর্তমানে আরো নতুন নতুন কাজ বৃদ্ধি হওয়ায় আরো অর্থের প্রয়োজন হবে বলে জানায় ম্যাক্স ইনফ্রাসট্রাকচার লিমিটেড-এর কতৃপক্ষ। বরাদ্দকৃত অর্থে নতুন রেলপথ নির্মান (মেইনলাইন)-৬.৭২৪ কি.মি. নতুন রেলপথ নির্মান (লুপলাইন)-২.৩৬ কি.মি. মাইনর ব্রীজ নির্মান ৭টি, লেবেল ক্রসিং গেট ২টি, কালার লাইট সিগন্যালিংসহ টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম প্রবর্তন ১টি স্টেশন, এ্যাপ্রোচ রোড ১১০০ বর্গমিটার, রেস্ট হাউজ (দ্বি-তল) ১টি এবং অন্যান্য স্থাপনা যেমন, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস হাউস ৫ তলা ভবন, টিএক্সআর অফিস, এ্যাটেনডেন্ট ব্যারাক ও মেশিনরুম। এই প্রকল্পগুলোর কাজ ম্যাক্স ইনফ্রাসট্রাকচার লিমিটেডের কর্মকর্তা গণের দক্ষ পরিচালনা ও সু-দৃষ্টিতে দ্রæত এগিয়ে চলছে। এই দৃশ্যমান কাজ দেখে আজ গোটা নীলফামারী জেলার মানুষ তাকিয়ে আছে চিলাহাটি স্থলবন্দর বাস্তবায়নের দিকে। চিলাহাটি রেলষ্টেশনকে আন্তর্জাতিক মানের স্টেশনে রূপান্তর করার কাজ চলছে। অপরদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দকৃত ৩১ কোটি রুপি দিয়ে ভারতের হলদীবাড়ি অংশে ৪ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার রেলপথ স্থাপনের কাজ ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর শুরু করা হয় এবং যা ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ সমাপ্ত করে। বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার চিলাহাটি ডাঙ্গাপাড়া সীমান্ত বিপি ৭৮২/২ এস নম্বর পিলারের নিকটবর্তী কাটাতারের বেড়া পর্যন্ত ভারতের রেল মন্ত্রনালয় পরীক্ষামূলকভাবে রেলের বগি সহ ইঞ্জিন চালিয়েছে। সেদিন ইঞ্জিন যাত্রার সূচনা করেছিলেন, ভারতের এনজেপির ডেপুটি চিপ ইঞ্জিনিয়ার (নির্মান) রামকুমার বাদল। ভারতের হলদীবাড়ি রেলস্টেশনটিকে আন্তর্জাতিক মানের রেলস্টেশন করার নির্মান কাজ গত মাসেই শেষ হয়েছে। চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেললিংকের কাজ শুরু হওয়ায় আনন্দ খুশীতে এখন আতœহারা উত্তরের নীলফামারী জেলার মানুষজন। ১৫০ বছর আগের কথা। আজকের বাংলদেশের উত্তরের নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের শুরুটা ছিল আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েকে ঘিরে। পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা এ দেশের বিভিন্ন অ ল থেকে স¤পদ আহরণের জন্য নির্মাণ করতে থাকে রেলপথ। আর সেই রেলপথগুলো পুরো ভারত উপমহাদেশকে একসঙ্গে বেঁধেছিল। সেই সময়ে ১৮৭০ সালে ইংরেজ বেনিয়ারা সৈয়দপুরে বিশাল রেলওয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠিত করে। যা আজও বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা হিসেবে পরিচিত। আসাম-বেঙ্গল রেলপথকে ঘিরে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ১১০ একর জায়গার ওপর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট ভারত ভাগের পরও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি মধ্যে এই ইন্টারচেঞ্জ চালু ছিল। সে সময় চিলাহাটি ও হলদিবাড়ি স্টেশনের উজ্জ্বল ইতিহাস স্মরণ করে এখনও গর্ববোধ করেন এলাকার বাসিন্দারা। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত হলদিবাড়ির সঙ্গে পাকিস্তানের রেল যোগাযোগ ছিল। ১৯৪৭ সালের ভারতের স্বাধীনতার আগে হলদিবাড়ি-চিলাহাটি দিয়ে সরাসরি কলকাতার যোগাযোগ ছিল। দার্জিলিং মেল ট্রেনটি তখন এই পথে দর্শনা হয়ে যাতায়াত করতো। সেই সময় চিলাহাটি হলদিবাড়ির গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। দেশ ভাগের পরেও চিলাহাটি থেকে একটিমাত্র ট্রেন ছিল হলদিবাড়ি-চিলাহাটি। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর তাও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর এটি আর চালু হয়নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে রেল রুটটি চালুর উদ্দোগ নেয়। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় এই পরিত্যক্ত রেলপথটি পুনঃস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ৮ মে থেকে সপ্তাহ ব্যাপী বাংলাদেশের অংশের এবং ২০১৭ সালের গোড়ার দিকে ভারতের অংশের জরিপ কাজ শেষ করা হয়। দীর্ঘ ৫ দশক পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া চিলাহাটি-হলদিবাড়ির পরিত্যক্ত রেলপথকে পুনরায় চালু করেছেন। যার ফলে বদলে যাবে চিলাহাটি-হলদিবাড়ির চেহারা এবং এর পাশাপাশি স্থলবন্দরের কার্যক্রম চালু হলে এলাকার হাজার হাজার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। রেলওয়ে সুত্র মতে বর্তমানে খুলনার মংলা, ঢাকা ও রাজশাহী থেকে সরাসরি ব্রডগেজের রেলপথ চালু রয়েছে নীলফামারী চিলাহাটি সীমান্তের স্টেশন পর্যন্ত। কাজ সম্পন্ন হলে ভারতের হলদীবাড়ি হয়ে জলপাইগুড়ি, নিউ জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ি সাথে ফের সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হবে। এখন ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী এক্সপ্রেস চলাচল করে কলকাতা-গেদে-দর্শনা-হার্ডিঞ্জ ব্রিজ হয়ে ঢাকা চলাচল করে। হলদিবাড়ি-চিলাহাটি রেলপথ চালু হলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ হয়ে ফের অতীতের পথে শিলিগুড়ি-কলকাতা রেল চলাচল শুরু হবে। সেই সাথে ঢাকা নিউ জলপাইগুড়ি(শিলিগুড়ি) ট্রেন চলাচল করবে সরাসরি। সুত্র মতে রেলপথ স্থাপন শেষ হলে প্রথম ধাপে চলাচল করবে পন্যবাহী রেল এবং দ্বিতীয় ধাপে যাত্রীবাহী ট্রেন। যাত্রীবাহী ট্রেনের মধ্যে ঢাকা হতে নিউ জলপাইগুড়ি(শিলিগুড়ি) ও নিউ জলপাইগুড়ি থেকে বাংলাদেশের দর্শনা সীমান্ত হয়ে কলকাতা শিয়ালদহ পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করবে।

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © uttorersomoy.com
Design BY NewsMoon.Com