মঙ্গলবার, ১৪ Jul ২০২০, ০৮:৪০ পূর্বাহ্ন




করোনাকালে লেখকদের চালচিত্র

করোনাকালে লেখকদের চালচিত্র

রেজাউল করিম জীবন
মহামারি করোনা ভাইরাসের দৌড়াত্বের এই সময়ে বিরামহীন ছুটে চলা মানুষের হঠাৎ নিরব হয়ে যাওয়া, অবসর সময়ে অন্যান্যদের মতো লেখকদের কেমন কাটছে সময়, সেই জানার আগ্রহ থেকে লেখকদের চালচিত্র নিয়ে কথা বলা। লেখকরা নিজেরাই বর্ণনা করেছেন বর্তমান মহামারি করোনাকালীন সময়ে তাদের চালচিত্র নিয়ে। নিচে তুলে ধরা হলোঃ

প্রাবন্ধিক ও গবেষক রেজাউল করিম মুকুলঃ
মহামারি করোনার কারনে অখন্ড অবসর। অবসর আমাকে গৃহবন্দী করেছে অনেক আগেই। অদৃশ্য শত্রু করোনা এবারে দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছে। করোনা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বিভিন্ন ধর্মে, গোত্রে, সমাজে, বর্ণে বিভক্ত শুধুই মানুষকে, পশুদের বেলায় এমনটি হয় নাই। যেহেতু লেখালেখি করি, এটাই আমার নেশা, করোনা আমার জন্যে সাপেবর হলেও সোসাল ডিসট্যান্সিং আমি কোনদিনই পছন্দ করতাম না। রেজাউল করিম জীবন, মৌচাক সম্পাদক প্রায় প্রতিদিনই খবর নেয়, ভাই কি করছেন? অর্থাৎ কি লিখছেন? সে যথার্থ প্রশ্নই করেছে। আমার অসম্পূর্ন লেখাগুলো এখন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে, একটু একটু করে কথা বলতে শুরু করছে। আমার একটি কিশোর উপযোগী বই “গল্পগুলো গণিতের” শুরু করেছিলাম এখন থেকে বার বছর আগে, সেটি শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ বইটি লিখতে গিয়ে বুঝলাম অঙ্কের জগতে মিথ্যার স্থান নেই। অঙ্কবীদ বা বিজ্ঞানীদের অনুমানগুলো সুন্দর বলেই সেগুলো অসত্য নয়। অনুমানগুলো মিথ্যে হলে এ পৃথিবী, মহাকাশ, মহাবিশ্ব সবকিছুই অসুন্দর হয়ে যায় যা আমাদের জানার কৌতুহল সৃষ্টি করবে না। অঙ্ক ছাড়া কোন বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি সম্ভব নয়- এ গ্রহে বা অন্য কোন গ্রহে। একাত্তরের পটভূমিতে আমার লেখা একটি অর্ধ সমাপ্ত উপন্যাস, “যুদ্ধে যাওয়ার দিনগুলি” এবারে শেষ করতে পারবো আশা করি। এখন ফেসবুক বলতে পারো আমার অবসর জীবনের নিত্যদিনের সঙ্গি। ফেসবুক এখন এমন একটি সামাজিক মিডিয়া, এখানে যে কেউ মনের মাধুরি মিশিয়ে লিখতে পারে তার না বলা মনের কথা, গল্পের সংলাপ, কবিতার পয়ার-পংক্তি, আর ছড়ার ছন্দ। ওপেন মিডিয়া ফেসবুকে নিজেই লেখক, নিজেই প্রকাশক, নিজের লেখায় নিজেই লাইক দেয়, কমেন্টস করে, আলোচনা করে। ফেসবুকে সবাই ডাক্তার, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ সেজে জ্ঞান দিতে পারে অন্যদেরও। আমিও অনেকের মতো এই ফেসবুক ঘেটেই চলি করোনাময় এইসব দিনরাত্রিতে।

কবি ও কথাসাহিত্যিক, সংগঠক রানা মাসুদঃ
আমি ঠিক সেই অর্থে কোয়ারেন্টাইনে নেই। আমার একটা প্রতিষ্ঠান জরুরি সেবা কার্যক্রমের মধ্যে পড়ায় সেখানে আমাকে নিয়মিত যেতে হচ্ছে। যদিও আমার স্টাফ ও ম্যানেজার আমাকে যেতে নিষেধ করে কিন্তু আমি এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে ওদের সাথে থাকতে চাই। ওরা যেন মনে না করে যে চাকরি করে বলে আমি ওদের ডিউটিতে রেখে নিজে আরামে আছি।
আমার কাছে ছুটি কিছুটা এই কারণে যে অন্য সময় ব্যবসার কারণে আমাকে সকাল দশটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। সে কারণে বিকেল বা সন্ধ্যায় ফেরাটা অনেক সময় পাওয়া যায়।
সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরে আমার আরেক অন্যতম শখ বাগান করা ,সেই গাছ পালার সাথে একটু সময় কাটাই। সন্ধ্যার পর থেকে লেখালেখি ও পড়াশোনার পেছনে সময় দিচ্ছি বেশ।
অনেক দিন ধরে দুটো কাজ করার চেষ্টা করছিলাম। এর মধ্যে তিস্তা নদীর আদ্যপান্ত নিয়ে একটা তথ্য উপাত্ত সমৃদ্ধ বইয়ের পাÐুলিপি সম্পূর্ণ শেষ করেছি। এমনকি একটি প্রকাশনা সংস্থা সেটা নিয়েও গেছে। তারা বাসায় বসে কম্পিউটার কম্পোজের কাজ শেষ করবে।
আরেকটি বড় কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। মহান মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের ঘটনা ও গৌরবগাঁথা নিয়ে কয়েকটি ভাগে যে কাজটি করার চেষ্টা করছিলাম তার অন্যতম প্রধান অংশটি ‘একাত্তরের উত্তাল মার্চঃ রংপুরের ডায়েরি ‘ শীর্ষক লেখাটি প্রায় শেষের দিকে। এটি এবং তিস্তা নিয়ে লেখাটা আমার লেখালেখি জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে আমার কাছে মনে হচ্ছে।
আমি এই পর্যাপ্ত ছুটির সময়টা এভাবেই কাজে লাগাচ্ছি। এর সাথে নামাজ বন্দেগী ও রোজা যথারীতি করছি। ধন্যবাদ।

কবি ও সংগঠক মনজিল মুরাদ লাভলুঃ
সবকিছু ঠিকঠাকই ছিলো। বইমেলার প্রস্তুতি, লায়ন্স ক্লাবের ডিস্ট্রিক্ট কনভেনশন, জাতীয় কবিতা পরিষদ রংপুরের নিয়মিত সাপ্তাহিক আসর ,নিজ এলাকা চিলাহাটিতে আমার বইয়ের প্রকাশনা উৎসব সহ সাংগঠনিক নানান কাজের রুটিন মাফিক পরিকল্পনা।

কিন্তু দুনিয়া কাঁপানো এক অদৃশ্য শত্রু ( ভাইরাস) এসে এমন ভাবে চেপে বসলো মানুষ ও মানবতার ঘাড়ে তাতেই উলঠ পালট হয়ে গেল সবকিছু। নিজেকে বাঁচতে ও স্বজনদের বাঁচাতে একরকম অসামাজিক মানুষ হয়ে নিজেই বন্দী দশায় আটকে আছি দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে।

কবে যে এই বন্দী দশা থেকে বের হতে পারবো কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইতিমধ্যে দু’ লক্ষাধিক মানুষ মারা গেছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে। আক্রান্ত প্রায় ত্রিশ লক্ষ। বাংলাদেশের অবস্থা প্রতিদিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। বিশ্বের নানান গবেষণা সংস্থা থেকে আসছে নানান তথ্য। কখনো ভয়ংকর আবার কখনো আশার বাণী শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। এই যখন অবস্থা,

তখন কেমন কাটছে করোনা কালের এই ঘরবন্দি সময়-
আসলে দৈনন্দিন জীবনের রুটিন অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে এখন। বইপড়া ও কবিতা লেখার মধ্যে বড় একটা সময় যাচ্ছে। সাংসারিক কাজে সময় দিতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সুবিধাটা হলো সাংসারিক অনেক কাজের সাথে আমার অনেক আগের সখ্যতা। পরিবারের একজন হাসপাতাল কেন্দ্রীক চাকরির সাথে যুক্ত থাকায় সীমাহীন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে যাচ্ছে দিনগুলো। সারাদিন পুরোটা সময়ই বাসায় থাকলেও হয় বাসার ছাদে নতুবা অলিগলিতে শারীরিক দুরত্ব বজায় রেখে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতে হয় ডায়াবেটিসের কারণে। নিয়মিত নামাজ আদায় করছি বরাবরের মতই।
করোনায় আক্রান্ত মৃত মানুষের দাফনের ছবি টিভিতে দেখে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অসহায় মনে হয় নিজেকে।
আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হউন।

কবি ও ছড়াকার মতিয়ার রহমানঃ
বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনার প্রাদুর্ভাব মানুষের জীবন চলার পথকে করেছে স্থবির। মানুষ আজ আতংকের মধ্যে নিমজ্জিত। সবার মত আমিও গৃহবন্দি। হাতে অঢেল সময়। জরুরী কিছু কাজে মাঝে মধ্যে অফিসে যেতে হয়। আর সারাদিন প্রায় ঘরে শুয়ে বসে টিভি দেখে সময় কাটে। সবচেয়ে বেশি সুবিধা হয়েছে-ধূলো জমানো বুক সেল্ফে কিছু বই আছে,যেগুলো পড়ার সময় ও সুযোগ কোনোটাই এতোদিন হয়নি। সেগুলো এখন একটার পর একটা পড়ছি। পড়ছি আর ছড়া,কবিতা ও ছোটগল্প লিখছি।
এরই মধ্যে শুরু হলো রমজান মাস। নিয়মিত রোজা রাখছি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করছি। সময় পেলে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করছি। সপ্তাহে দু’একদিন বাজার করছি। আত্মীয় -স্বজন, বন্ধু ও শুভার্থীগণের খোঁজ-খবর করছি। সাধ্য মত অসহায় মানুষের সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।
মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে মাসাধিককাল ঘরে বন্দি থেকে আর ভালো লাগে না। মহান আল্লাহ্ এই মহামারীর কবল থেকে আমাদের হেফাজত করুন।
আমীন।

তরুণ কবি মুহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহ্ঃ
মেডিকেল লাইফের কঠিনতম একটা অধ্যায় প্রফেশনাল এক্সাম। সেটা শেষ করেই শরীরটা একটু মোচড় দিয়েছিলাম। প্রিয় সাহিত্য অঙ্গনে কবি বন্ধুদের সাথে আড্ডা, বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো।ঠিক সেইসময় কঠিন পরিস্থিতির মাঝে পড়ে গেল আমাদের দেশ,আমাদের শহরতলি। শুরু হলো আমার হোম কোয়ারেন্টাইন এর দিনগুলো।

অখÐ অবসরের এই দিনগুলো বাসায় বসে খুব যে খারাপ কাটছে তাও কিন্তু নয়। দিনের শুরুটা একটু বিলম্বে হলেও বিকেলটা কাটছে শৈশবের মতো।ছাঁদে ঘুড়ি উড়ানো,ছাদবাগানের গাছগুলোর যতœ নেয়া,পরিবারের সবার সাথে গল্প করা।কখনো মুড়ি চানাচুর কখনো বা চাল ভাঁজা দিয়ে বিকেলের আড্ডা। আড্ডার সাথে যোগ হলো প্রতিবেশীরা।বিকেলের এই শহরতলি তে সবাই ছাঁদে উঠে নিজেদের কে সময় দেয়।এক ছাঁদ থেকে আরেক ছাঁদের প্রতিবেশীদের খোঁজ খবর নেওয়া। যেটা সেভাবে হয়নি এর আগে।

মাস পেরুতেই চলে আসলো পবিত্র মাহে রমজান। রান্নায় মাকে সহযোগিতা করা,নতুন নতুন রেসিপি রান্না করে কেটে যাচ্ছে পবিত্র এই মাস।তবে দুঃখ থেকেই যায়,মসজিদে গিয়ে নামাজ না পড়ার কষ্ট গুলো। তবে সেটা পূরণ হচ্ছে বাবার সাথে পরিবারের সবাই মিলে নামাজ পড়ার মাধ্যমে।

তবুও একঘেয়েমির এই সময়টা ভীষণ ভাবে মনে পড়ে টাউন হলের সন্ধ্যার আড্ডা গুলো।তবে প্রযুক্তির এই যুগে প্রশান্তি দিয়েছে মুঠোফোন আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। নিয়মিত ফোনে দিয়ে খোঁজ খবর নেন মৌচাক সম্পাদক রেজাউল করিম জীবন ভাই। একাধারে সাংবাদিক হওয়ায় রংপুরের খবরাখবর গুলো জেনে নেই। ভালো লাগে যখন মৌচাক পরিবারের মতো রংপুরের প্রায় সবগুলো সাহিত্য সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে এই মহামারির কঠিনতম পরিস্থিতিতে আর্তমানবতার সেবায়। ফোনে প্রায়শই কথা হয় প্রবীন সাহিত্যিক সর্বজন শ্রদ্ধেয় এ কে এম শহীদুর রহমান বিশুদা। পরম শ্রদ্ধেয় কবি তৈয়বুর রহমান বাবু ভাই, কবি বাশার ইবনে জহুর ভাই, কবি সালমা সেতারা খালা, কবি জাহিদ হোসেন ভাই। কল দিয়ে লেখালেখির ভুল শুধরায় দেন বাংলা একাডেমির সহকারী পরিচালক আবিদ করিম মুন্না ভাই।

কিন্তু সবচেয়ে আনন্দের এবং গর্বের বিষয় হলো কবি মিনার বসুনিয়ার এক অমর সৃষ্টি, তার রচিত কবিতা যেভাবে সারা বাংলাদেশসহ বিশ্বে ছড়িয়ে গিয়েছে সেটা সত্যি আমাদের জন্য গর্বের।প্রতিদিন নতুন নতুন সাফল্যের সংবাদ শুনেছি।”ঈশ্বর হক সবার” কবিতাটি প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নুর স্যারের কণ্ঠে আবৃত্তি হয় যা দেশের বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে প্রচার হয়। কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক স্যারের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় প্রথম আলোর অনলাইনে পোর্টালে।

সরাসরি আড্ডা না হলেও ভিডিওকলে কবি ও কবিতা নিয়ে লাইভ প্রোগ্রাম হয় পাতা প্রকাশের সৌজন্যে। পাতা প্রকাশের সম্পাদক শ্রদ্ধেয় জাকির আহমদ ভাইয়ের উপস্থাপনায় যুক্ত হয়েছিলেন কবি মজনুর রহমান, কবি মাসুদ বশীর, কবি নুর ইসলাম, কবি ফেরদৌস রহমান, কবি শিস খন্দকারসহ অনেকে।

সবচেয়ে সুখবর হলো আমাদের উঠতি তরুণ কবিরা একদম বসে নেই। ফজলে রাব্বী, ছড়াকার হিসেবে যে সম্ভাবনাময় একজন তরুণ। তার একটি ছড়া সবার মাঝে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়েছে এরই মাঝে। তাছাড়া একদম তরুণদের মাঝে মিকদাদ মুগ্ধ, আহসান লাবিব,অনিরুদ্ধ সরকার প্রথম, অর্কদের চেষ্টা ও সাধনা এই করোনাকালে প্রকোপ আকার ধারণ করেছে।

রাত জেগে জেগে নাটক সিনেমা দেখার পাশাপাশি শরৎকাহিনী,কবি শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা,কবি আবুল হাসানের কবিতা পড়ে বেশ ভালোই যাচ্ছে দিনগুলো।

আতঙ্কের মাঝেও সময় কেটে যাচ্ছে একটি সুন্দর পৃথিবীর অপেক্ষায়। এই মহামারি শেষে আবারও দেখা হবে প্রিয় মানুষ গুলোর সাথে। জীবন চাকা থমকে যেন না যায়,সবাই যেন সুস্থ থাকে এই প্রার্থনা করেই কাটছে অবসর জীবনযাপন।

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © uttorersomoy.com
Design BY NewsMoon.Com