মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২০, ০৪:৫৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম
২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ৩৩, শনাক্ত ২৯৯৬ ঘরোয়া দুই উপায়ে দূর করুন মেছতা সুস্থ হয়ে ফিরলেন এক কোটি ৩১ লাখ ষড়যন্ত্রের খবর উড়িয়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক রঞ্জুর বৃক্ষরোপণ দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কায় প্রস্তুতির নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর ড. ওয়া‌জেদ মিয়ার কবর জিয়ারত কর‌লেন নবাগত বিভাগীয় ক‌মিশনার আব্দুল ওয়াহাব গোবিন্দগঞ্জে পুলিশি অভিযানে ৬ জুয়ারি গ্রেফতার জাতীয় শোক দিবস পালন উপলক্ষে জলঢাকায় উপজেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত গোবিন্দগঞ্জে ডিজিটাল জিটুপি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত




বইমেলায় উত্তরাঞ্চলের একমাত্র সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানানুশীলনকেন্দ্র আইডিয়া প্রকাশন

বইমেলায় উত্তরাঞ্চলের একমাত্র সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানানুশীলনকেন্দ্র আইডিয়া প্রকাশন

স্টাফ রিপোর্টার :
রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা কিংবা প্রকাশনার শেকড় অনেক গভীরে। ১৯০৫ সালে আটাশজন সদস্য নিয়ে রংপুরে ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ’র নামে একটি সংগঠন যাত্রা শুরু করেছিলো। তৎকালীন সময়ে কোলকাতার বাইরে এটি ছিল ঐতিহাসিক গবেষকদের কেন্দ্র। এছাড়াও বাংলাদেশে প্রথম মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়েছিলো রংপুরে। রংপুর থেকে কুÐি জমিদার কালীচন্দ্র রায় চৌধুরীর হাত ধরে প্রথম প্রকাশিত হয় রঙ্গপুর বার্তাবহ নামে একটি পত্রিকা। যে কারণে এ অঞ্চলে সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার ইতিহাস অনেক প্রাচীন, সেই ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছে রংপুরের সাহিত্যমোদী মানুষ।
কালের বিবর্তনে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। প্রকাশনা ও সাহিত্য সৃজন বিকাশের কেন্দ্র মুখ হিসেবে ঢাকাই এখন অগ্রমুখী। ফেব্রæয়ারিতে ঢাকায় বাংলা একাডেমি আয়োজিত মাসব্যাপী বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই বইমেলা এখন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক এবং জ্ঞানানুশীলনের কেন্দ্র। কিন্তু দীর্ঘদিনের এই সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানানুশীলনের চর্চাকেন্দ্রে অংশগ্রহণ করা রংপুরে মানুষের জন্য ছিলো স্বপ্নের মতো। যে কারণে দীর্ঘদিন প্রতিযোগিতামূলক সাহিত্যচর্চা ও লেখকদের বিকশিত হবার সুযোগ ছিলো সামান্যই। তবে গত দশ-পনের বছরে বাংলাদেশের প্রকাশনা জগৎ বেশ বিকশিত হয়েছে। এবং রংপুর অঞ্চলের সাংস্কৃতিক এবং জ্ঞানানুশীলনের অবস্থারও পরিবর্তন এসেছে। এ পরিবর্তন এনেছে রংপুরের আইডিয়া প্রকাশন ও প্রকাশক সাকিল মাসুদ।


প্রতিযোগীতামূলক পৃথিবীতে সভ্যতার অগ্রগতির জন্য বইয়ের বিকল্প কিছু নেই। নিজেকে জানতে হলে, বুঝতে হলে এবং দক্ষ করে তুলতে হলে বই পড়াই একমাত্র পথ। ভালো বই মানুষকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করে। ভালো বই কাউকে প্রতারণার শিক্ষা দেয় না। বরং প্রতারণাকে চিহ্নিত করার কৌশল শিখিয়ে দেয়। এই লক্ষ্যে রংপুরের লেখদেরর সাথে সারা দেশের পাঠকের বন্ধন তৈরি করতে গত এক দশক ধরে কাজ করে যাচ্ছেন সৃজনশীল জ্ঞান-সাহিত্যকর্ম প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘আইডিয়া প্রকাশন’র প্রকাশক ও কবি মাসুদ রানা সাকিল। অলাভজনকভাবে পুঁজি বিনিয়োগ করে এ কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ অঞ্চলের লেখকদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তার হাত ধরেই একুশের বইমেলায় লেখক, প্রচ্ছদশিল্পী এবং পাঠকের মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ঘটছে। মতবিনিময় হচ্ছে। যা প্রতিযোগিতামূলক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানানুশীলনের জগতে ইতিবাচক দিক বলে মত বিশ্লষকদের। এবারের বইমেলাকে ঘিরে রংপুর থেকেই প্রকাশিত হবে প্রায় অর্ধশতাধিক বই। গত ১০ বছরে প্রায় ২শতাধিক বই প্রকাশ করেছে রংপুরের আইডিয়া প্রকাশন। এছাড়াও ছোট্ট কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা বই প্রকাশ করছে।
‘ঘরে ঘরে পাঠাগার, জনে জনে পাঠক’ এই ¯েøাগানে রংপুর অঞ্চলের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানানুশীলনকে প্রসারিত করার কাজ করছে কবি ও প্রকাশক মাসুদ রানা সাকিল। ঢাকা কেন্দ্রীকতার সাথে তাল মিলিয়ে রংপুরের প্রকাশনা শিল্পকে তুলে ধরছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। সবার কাছে বই পৌঁছে দিতে হবে এটাই এখন তার সংকল্প। বিভিন্ন পাঠাগার ও ব্যক্তি পর্যায়ে প্রায় ৫হাজারের মতো বই বিনামূল্যে বিতরণ করেছেন তিনি। ব্যক্তিগত তহবিল বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘাটতি দিয়ে অংশগ্রহণ করছেন বাংলা একাডেমি আয়োজিত ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মেলায়। রংপুর অঞ্চলের লেখকদের জন্য উন্মোচন করেছে নতুন দুয়ার।
বইমেলা, বইপড়া ও সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা সম্পর্কে আইডিয়া প্রকাশন’র প্রকাশক মাসুদ রানা সাকিল জানান, আমরা চাই ‘ঘরে ঘরে পাঠাগার, জনে জনে পাঠক’। মিলিয়ে আমাদের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২শতাধিক। আশা করা যায় বইগুলো খুব শীঘ্রই প্রতিযোগিতামূলক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানানুশীলনের জগতে মাইলফলক হিসেবে বিস্ফোরিত হবে। একেবারে অলাভজনকভাবে পুঁজি বিনিয়োগ করে এ কাজ করছি। আমাদের নিজস্ব একটি পাঠাগারও আছে। বইপড়াকে উৎসাহিত করে আমরা প্রায় ৫হাজারের মতো বই বিভিন্ন পাঠাগার ও ব্যক্তি পর্যায়ে বিনামূল্যে বিতরণ করেছি। রংপুর এমন একটি শহর যেখানে একাডেমিক শিক্ষার বাইরে সৃজনশীল জ্ঞানচর্চা করা মানুষের অভাব প্রকট। সেরকম জায়গায় একটি প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।
এ সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক ড. জালাল উদ্দিন আকবর জানান, আমরা যারা লেখালেখি করি তাদের জন্য ঢাকায় গিয়ে বই প্রকাশ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন, স্বপ্নের মতো। আমরা যতই সাহিত্যচর্চা করি না কেন এসব তুলে ধরার ক্ষেত্রে মূল ভ‚মিকা প্রকাশকের। হাজারও লেখকের সমষ্টি হলেন একজন প্রকাশক। ‘আইডিয়া প্রকাশন’র বই প্রকাশের উদ্যোগ এবং জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ রংপুরের জন্য নতুন এক মাত্রা। আমার জানা রংপুরের অনেক কবি সাহিত্যিক আছেন, যারা নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করলেও বই প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন সুযোগ ছিল না। সম্প্রতি রংপুরের মাসুদ রানা সাকিল সে সুযোগ করে দিয়েছে। এতে করে রংপুরের পাঠক এবং লেখক উভয়ের মধ্যেই সেতুবন্ধন তৈরি হচ্ছে। আইডিয়া প্রকাশন ছাড়াও কয়েকটি ছোট্ট ছোট্ট প্রকাশনা কাজ করছে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রংপুরে সাহিত্যচর্চা বাঁক পরিবর্তন ঘটবে আশা করা যায়।
ঢাকার বাইরে সাহিত্যচর্চা, বইমেলা এবং প্রকাশনা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে সাহিত্যিক ও অধ্যাপক আতাহার আলী খান জানান, আমরা অনেক জায়গায় বলিÑ ‘বই বেশি বেশি পাঠ করতে হবে’। এক্ষেত্রে বইমেলা, লাইব্রেরি ও প্রকাশনা একে অপরের পরিপূরক। আঞ্চলিক পর্যায়ে সাহিত্যচর্চা এবং বই প্রকাশ খুবই কঠিন কাজ। এ ধরণের কাজকে উৎসাহিত করা সকলের উচিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি এবং সরকারেরও উৎসাহ দেয়ার ক্ষেত্রে ভ‚মিকা রাখা দরকার। তবে এ সকল কাজের ক্ষেত্রে সুচিন্তিত নীতিমালা আরোপ করারও দরকার আছে।
গত ১০ বছর আগেও রংপুর থেকে বই প্রকাশ করে জাতীয় গ্রন্থমেলায় তুলে ধরার ছিল না কোন সুযোগ। কারণ গত ১০ বছর আগেও কোন সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা রংপুরে ছিলো না। এ অঞ্চলের লেখকদের ঢাকা যেয়ে বই প্রকাশ করতে হতো। তাতে ছিল নানান রকমের সমস্যা ও সংকট। ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ বই প্রকাশ করলেও সেগুলো জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার কোন জায়গা ছিল না তাদের। যে কারণে এ অঞ্চলের সাহিত্যচর্চা ছিল শুধুমাত্র রংপুর কেন্দ্রীক। এ অঞ্চলের সাহিত্যচর্চার ঐতিহ্য থাকলেও প্রতিযোগিতামূলক সাহিত্যচর্চার অভাব ছিল ব্যাপক। প্রকাশের সুযোগ না থাকায় লেখালেখিতে যারা ভালো ছিল তারাও একসময় অনাগ্রহী হয়ে পড়তেন।
রংপুর অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি থাকলেও নেই এ ভাষার গুণগত টেকসই সাহিত্যচর্চা। বরং এ অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতিকে এক প্রকার গরিব, খেটে খাওয়া ও অশিক্ষিত লোকের ভাষা-সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করে কেউ কেউ। জাতীয় পর্যায়ে এই অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে যুগের চাহিদামাফিক তুলে না ধরার ফলে ঐতিহ্যবাহী রংপুরের ভাষা ব্যবহারেও ঝিমুনি ধরেছে বলে অভিমত অনেকের।
উল্লেখ্য, যে কোনো বইয়ের পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু লেখকের, বইটির প্রকাশক থাকেন আড়ালে। কিন্তু বস্তুতপক্ষে লেখকের বই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবার সিঁড়িই হচ্ছেন একজন প্রকাশক। এবং লেখকের প্রতিনিধি হলেন প্রকাশকরা। যে কারণে লেখকের সঙ্গে প্রকাশকের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। একটি ভালো বই পাঠকের হাতে সূচারুরূপে পৌঁছে দিতে প্রকাশকের অবদান যে কত বড় তা খুব কম পাঠকই বইটি পড়ার সময় বিবেচনা করে থাকেন। যোগ্য লেখক-প্রকাশক হওয়া দুই কঠিন। প্রকাশককেই সমস্ত আর্থিক ও অন্যান্য ঝুঁকি নিতে হয়। যেখানে অর্থনৈতিক ঝুঁকির প্রশ্ন সেখানে সতর্কতা অবলম্বন না করে উপায় নেই।

নিউজটি শেয়ার করুন







© All rights reserved © uttorersomoy.com
Design BY NewsMoon.Com